পতেঙ্গার গুপ্ত খাল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল খালাসের একমাত্র স্থল। খালাসের আগে পরিমাপের (গেজিং) কাজ সম্পন্ন হয় গুপ্ত খালে বিপিসির তিনটি জেটিতে। যদিও তেল পরিমাপের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি পুরোপুরি অনুপস্থিত। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও নজরদারিও সেভাবে নেই। অনেকটা অরক্ষিত এসব জেটি থেকেই সনাতন পদ্ধতিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে বিপিসিকে। এসবের আড়ালে জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে এক ধরনের গুপ্ত ব্যবসা। পরিমাণে কম দিলেও বোঝার উপায় থাকছে না।
১৩ জানুয়ারি দুপুরে গুপ্ত খাল এলাকায় বিপিসির একটি জেটিতে গিয়ে চোখে পড়ে জ্বালানি তেল পরিমাপ ও খালাসের রহস্যময় দৃশ্য। দেখা যায়, একটি মাছ ধরার ট্রলারে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যার রিডিং উঠছে স্বয়ংক্রিয় মিটারে। পাশেই অন্য একটি অয়েল ট্যাংকার থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে মেঘনা পেট্রোলিয়ামকে। কিন্তু তেল পরিমাপের কোনো মিটার নেই। বিপিসির কর্মকর্তারা সার্ভেয়ারের মাধ্যমে ঘণ্টাখানেক আগেই সনাতন পদ্ধতিতে পরিমাপ শেষ করে গেছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পদ্ধতিগত ত্রুটির সুযোগ নিয়ে বিপিসিকে কম তেল সরবরাহ করছেন ট্যাংকার মালিকরা। স্থানীয় একটি চক্র ট্যাংকার মালিকদের কাছ থেকে এ তেল কিনে বিভিন্ন ট্রলার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ জালিয়াতিতে ট্রলার মালিকদের পাশাপাশি সম্পৃক্ত রয়েছেন বিপিসির কিছু কর্মকর্তাও।
চক্রটি খুবই শক্তিশালী বলে জানান বিপিসির সাবেক এক পরিচালক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সব পর্যায়ের সঙ্গে সখ্য রেখে বছরের পর বছর এ ব্যবসা করে আসছে চক্রটি। বহির্নোঙরের বিশাল জলসীমায় রয়েছে তাদের একক আধিপত্য।
হিসাবমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে প্রতিটি ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহন হয় ২-৩ হাজার টন। প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচটি ট্যাংকার বন্দরের জেটিতে আসে। পরিমাপের সনাতনী পদ্ধতিতে ট্যাংকারপ্রতি ৫ টন তেল চুরি গেলেও তা ধরা কঠিন। অথচ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সবকিছু সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা যায়।
বিপিসির একটি সূত্র জানায়, সনাতনী পদ্ধতিতে পরিমাপের কারণে প্রতিদিন ২০-২৫ টন তেল চুরি ও অপচয় হয় বিপিসির। এতে বছরে ৬-৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল হারায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরে ৩০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১৫০-১৬০টি অয়েল ট্যাংকার পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহন করে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। বড় ট্যাংকার থেকে অটোগেজিং পদ্ধতিতে তা ছোট ট্যাংকারে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এর পর তা আনা হয় বিপিসির জেটিতে। ছোট ট্যাংকার থেকে গজ ও ফিতা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পরিমাপ করে বিপিসিকে বুঝিয়ে দেয়া হয় এ তেল। এখানেই ঘটে সবচেয়ে বড় জালিয়াতি। যদিও বিশ্বে এ পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল পরিমাপের রেওয়াজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এছাড়া জ্বালানি তেল পরিবহনকারী এসব অয়েল ট্যাংকারের বড় অংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। ২০-৩০ বছরের পুরনো এসব জাহাজ থেকে পরিমাপে হেরফের দেখিয়ে সহজেই জ্বালানি তেল চুরি করা সম্ভব।
ট্যাংকার নিয়ে এ ধরনের অভিযোগের কথা স্বীকার করলেও এ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ট্যাংকার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম জামান রোমেল। তিনি বলেন, এ ব্যবসায় নতুন অনেক ট্যাংকার রয়েছে, যা অত্যন্ত আধুনিক। চুরির কোনো সুযোগ নেই সেখানে।
এদিকে সার্ভেয়ার দিয়ে বিপিসির তেল পরিমাপ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো সার্ভেয়ার নেই। তালিকাভুক্ত চারটি সার্ভে প্রতিষ্ঠান এনএ সার্ভে, এবি সার্ভে, ইস্টার্ন সার্ভে ও ট্রাইস্টার সার্ভে দিয়ে জ্বালানি তেল পরিমাপ করে বিপিসি। এ চার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসজিএস ও আইটিএস কোম্পানির মাধ্যমেও তেল পরিমাপ করে থাকে তারা।
গত পাঁচ বছরে বিপিসির হাল ধরেছেন চারজন চেয়ারম্যান। তার পরও বিপিসিকে অটোমেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ গুপ্ত খালের টার্মিনাল শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনতে ১০০ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে না বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক পরিচালক।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিপিসির চেয়ারম্যান এ এম বদরুদ্দোজা বণিক বার্তাকে বলেন, বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে রাডার অটোগেজিং পদ্ধতিতে তেল পরিমাপ করা হয়। এর পর ছোট ট্যাংকারে করে তা বন্দরে আনা হয়। সেখানে সনাতনী পদ্ধতিতে গেজিং করা হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের টার্মিনাল পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে হিসাব-নিকাশ সহজ হতো। খরচও কমে যেত। কিন্তু শুধু অটোমেশন করলেই হবে না। তা চালানোর মতো পর্যাপ্ত জনবলও লাগবে। বিপিসি তীব্র জনবল সংকটে রয়েছে। সবার আগে প্রয়োজন বিপিসির নতুন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেয়া।
No comments:
Post a Comment