as

Wednesday, January 20, 2016

ইবনে সিনা ফার্মায় অতিরিক্ত জনবল

মুনাফা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ

ইবনে সিনা ফার্মায় অতিরিক্ত জনবল

আলতাফ মাসুদ | ২০১৬-০১-২০ ইং
      
   Share   
ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডে প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি জনবল রয়েছে। কর্মী সংখ্যার বিপরীতে কোম্পানিটি যে পরিমাণ বার্ষিক টার্নওভার দেখায়, তা একই খাতের অন্য কোম্পানির তুলনায় অনেক কম। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নিট মুনাফা কমিয়ে দেখানোরও অভিযোগ উঠছে। কোম্পানির টার্নওভারের বিপরীতে নিট মুনাফা ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে ওষুধ খাতের অধিকাংশ কোম্পানিরই নিট মুনাফা মোট বিক্রির ১০ থেকে ২৬ শতাংশের সমান। দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে আসে।
২০১৪ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইবনে সিনা ফার্মায় মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬৪৯। এর মধ্যে ফার্মা ডিভিশনে ২ হাজার ৯৩১ ও ন্যাচারাল মেডিসিন ডিভিশনে ৭১৮ জন কর্মী রয়েছে তাদের। ২০১৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রির পরিমাণ ২৬৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। তবে এর চেয়ে প্রায় ৬০০ জনবল কম নিয়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বার্ষিক টার্নওভার ছিল পাঁচ গুণ বেশি। আর একই সময়ে ৬ হাজার ৭১০ জন কর্মী নিয়ে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৮ কোটি টাকা, যা ইবনে সিনা ফার্মার বার্ষিক টার্নওভারের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি।
এদিকে ওষুধ খাতের তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো পর্যালোচনা করলেও ইবনে সিনা ফার্মায় তুলনামূলক অতিরিক্ত জনবল দেখা যায়। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক ওষুধ কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মার মোট জনবল ৩৫২ জন। এর বিপরীতে ২০১৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটির টার্নওভার ছিল ৬৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
২০১৪ হিসাব বছরে ইবনে সিনা ফার্মা ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রশাসন, বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা কোম্পানির মোট বিক্রির ২৫ শতাংশের সমান। এ কোম্পানির মোট জনবলের মধ্যে ১৩৫ জন ছাড়া বাকি সবারই ন্যূনতম বেতন ৩৬ হাজার টাকা। ২০১৪ সালে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের জনবলের পেছনে বেতন-ভাতা বাবদ কোম্পানিটির ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ১২ লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা বার্ষিক মোট বিক্রির ১৮ শতাংশের বেশি। এর বাইরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত খরচ ১১ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জনবল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইবনে সিনা ফার্মার কোম্পানি সচিব মো. শহিদ ফারুকী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রয়োজনের চেয়ে কোম্পানিতে জনবল বেশি নেই। একই খাতের অন্য কোম্পানির জনবল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বাজারের নেতৃস্থানীয় কোম্পানি। তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও আমাদের চেয়ে বেশি। তাই সেসব কোম্পানির সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না।
আর কোম্পানির প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) জসিমউদ্দিন সরকার বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত জনবল বিষয়ে কিছুটা তথ্যগত বিভ্রাট রয়েছে। সেখানে ভুলবশত অস্থায়ী শ্রমিকদের মোট জনবলের আওতায় দেখানো হয়েছে।
এদিকে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা ইবনে সিনা ফার্মার বিরুদ্ধে নিট মুনাফা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ করছেন। তারা বলছেন, একই খাতের অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় ইবনে সিনা ফার্মার বিক্রির বিপরীতে নিট মুনাফা অনেক কম।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সাল থেকে কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফা কখনই মোট বিক্রির ৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি। ২০১০ সালে কোম্পানির নিট মুনাফার অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা ২০১৪ সালে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়। চলতি তিন প্রন্তিকেও নিট মুনাফার অনুপাত ৪ শতাংশের নিচে রয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ইবনে সিনা ফার্মার টার্নওভার ছিল ২২২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ সময় কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে নিট মুনাফার অনুপাত দাঁড়ায় মাত্র ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ।
অথচ এ খাতের তুলনামূলক ছোট কোম্পানিগুলোর টার্নওভারের বিপরীতে নিট মুনাফা অনেক বেশি রয়েছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে সেন্ট্রাল ফার্মার টার্নওভারের বিপরীতে নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফার্মা এইডসের নিট মুনাফার অনুপাত ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর ওষুধের বাজারে নেতৃস্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে হিসাব করলে ২০১৫ হিসাব বছরে স্কয়ার ফার্মার নিট মুনাফার অনুপাত প্রায় ১৯ শতাংশ, যা চলতি অর্ধবার্ষিকীতে ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একইভাবে চলতি অর্ধবার্ষিকীতে রেনাটার টার্নওভারের বিপরীতে নিট মুনাফা ১৬ দশমিক ২৪ শতাংশ ও বেক্সিমকো ফার্মার তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত নিট মুনাফা প্রায় ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চলতি তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত টার্নওভারের বিপরীতে ওরিয়ন ফার্মার নিট মুনাফার অনুপাত ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
নিট মুনাফা কম হওয়া প্রসঙ্গে ইবনে সিনার সিএফও জসিমউদ্দিন সরকার বলেন, স্কয়ার, রেনাটার মতো কোম্পানিগুলো মার্কেট লিডার। তাদের প্রডাক্ট রেঞ্জ অনেক বেশি। বিক্রি বেশি হওয়ার কারণে তাদের খরচও তুলনামূলক কম। এ কারণে সেসব কোম্পানির নিট মুনাফার অনুপাত বেশি। তবে আমরাও সম্প্রসারণে যাচ্ছি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আশা করছি, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মুনাফাও বাড়বে।
ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানির ৪৭ দশমিক ৩২ শতাংশ মালিকানা রয়েছে ইবনে সিনা ট্রাস্টের হাতে। মোট ১৫ একর জমির ওপর এ কোম্পানির কারখানা। ১৯৮৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইবনে সিনা ফার্মার বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ২২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

No comments:

Post a Comment